রামগড় সময় বদলায়, বদলে যায় দায়িত্বও। তবে কিছু স্থাপনা থেকে যায় সময়ের সাক্ষী হয়ে। রামগড়ের এমন কয়েকটি স্থাপনার সামনে দাঁড়িয়ে অতীতের সেই সময়কে ফিরে দেখলেন খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনের সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া। প্রায় দুই দশক আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালে যেসব উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল, শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রামগড় সফরে গিয়ে সেসবের কয়েকটি পরিদর্শন করেন তিনি।

গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ওয়াদুদ ভূঁইয়াকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়। শুক্রবার বিকেলে রামগড় সদর ইউনিয়নের নূরপুর এলাকায় তৈচালাপাড়া সংলগ্ন একটি পরিত্যক্ত ভবন দিয়ে তাঁর এই পরিদর্শন শুরু হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে একসময় সেখানে অনাথ ও এতিম বালক-বালিকাদের জন্য আবাসিক বিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়েছিল। এখন দীর্ঘদিনের অযত্ন-অবহেলায় ভবনটি পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। ভবনের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন ওয়াদুদ ভূঁইয়া। সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রকল্পটির অতীত ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন। তৎকালীন চেয়ারম্যান হিসেবে তিনিই ভবনটির উদ্বোধন করেছিলেন বলে পরিদর্শনকালে জানান তিনি। ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, তৎকালীন সময়ে উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে জায়গা কিনে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে আবাসিক অবকাঠামোটি নির্মাণ করা হয়েছিল। শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রমও এগিয়েছিল। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনের সময় প্রকল্পটির কার্যক্রম থেমে যায়। পরে আর এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। পরিত্যক্ত ভবনটির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখানে সব সম্প্রদায়ের শিশুর থাকার ও পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল। এত সম্ভাবনাময় একটি প্রকল্প এভাবে পড়ে থাকা কষ্টের। পরিদর্শনকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল অনুপ কুমার চাকমাও উপস্থিত ছিলেন।

বোর্ডের সরকারি ওয়েবসাইটেও তাঁকে বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুপ কুমার চাকমা বলেন, এত সুন্দর একটি জায়গায় এমন একটি স্থাপনা পড়ে থাকা দুঃখজনক। শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় কোনোভাবেই অবহেলার শিকার হওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, ভবনটি কাজে লাগানো গেলে এলাকার শিক্ষার্থীরা উপকৃত হতে পারে। পরিত্যক্ত আবাসিক বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে ওয়াদুদ ভূঁইয়া যান রামগড় কেন্দ্রীয় কবরস্থান-সংলগ্ন অসমাপ্ত টাউন হল ভবন পরিদর্শনে। পরে তিনি রামগড় লেকও ঘুরে দেখেন। একসময় যেসব প্রকল্পকে ঘিরে উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা দেখে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। পরিদর্শনকালে তাঁর সঙ্গে ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান শেখ ছালে আহম্মেদ, খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও জেলা পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল মালেক মিন্টু, জেলা বিএনপির সহসভাপতি হাফেজ আহম্মদ ভূঁইয়া, রামগড় উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক সাফায়েত মোর্শেদ ভূঁইয়া মিঠু, পৌর বিএনপির সভাপতি বাহার উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক শেফায়েত উল্ল্যাহসহ জেলা, উপজেলা ও পৌর বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সন্ধ্যায় রামগড় শিল্পী কমিউনিটি সেন্টারে উপজেলা ও পৌর বিএনপির যৌথ উদ্যোগে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন ওয়াদুদ ভূঁইয়া। উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. জসিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার, তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখা এবং পারস্পরিক সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। রাতের দিকে রামগড়ের শ্রীশ্রী দক্ষিণেশ্বরী কালীবাড়িতে যান তিনি। মন্দির কমিটির সভাপতি বাদল চক্রবর্তী, সাধারণ সম্পাদক স্বপন দেসহ কমিটির নেতৃবৃন্দ ও উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্যরা তাঁকে স্বাগত জানান। পরে স্থানীয় সনাতন সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি। মন্দিরে গিয়ে ওয়াদুদ ভূঁইয়া তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতিও স্মরণ করেন। পূজার সময় এই মন্দিরে আরতি করার কথা উল্লেখ করে তিনি মন্দিরের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা বলেন। মন্দিরের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে মতবিরোধ থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি দশমী ঘাটসহ মন্দিরের বিভিন্ন উন্নয়নকাজে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

পরদিন শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে পুনর্বাসন সহায়তা বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে ৪০টি পরিবারের প্রত্যেককে দুই বান্ডিল ঢেউটিন ও তিন হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়। ওয়াদুদ ভূঁইয়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে এসব সহায়তা তুলে দেন। রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক কাজী শামীমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো সরকারের দায়িত্ব। মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় ভবিষ্যতেও এ ধরনের সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন তিনি। রামগড় সফরের এই দুই দিনের নানা আয়োজনের মধ্যে যেন পুরোনো সময় ও বর্তমানের একটি যোগসূত্র তৈরি হয়। যে সময় ওয়াদুদ ভূঁইয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন, তখন নেওয়া কিছু প্রকল্পের স্থাপনা আজও দাঁড়িয়ে আছে—কোনোটি পরিত্যক্ত, কোনোটি অসমাপ্ত, আবার কোনোটি নতুন করে ব্যবহারের অপেক্ষায়। আর বর্তমানে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাজকর্ম সংসদীয় পর্যায়ে তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। রামগড়ের পুরোনো স্থাপনাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে এবারের পরিদর্শনে তাই শুধু কয়েকটি ভবনের বর্তমান অবস্থা দেখা হয়নি; ফিরে দেখা হয়েছে একসময় নেওয়া উন্নয়ন-পরিকল্পনার ইতিহাসও। অতীতের সেই প্রকল্পগুলোর অসমাপ্ত বাস্তবতা আর বর্তমানের নতুন দায়িত্ব—দুই সময়কে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার এবারের রামগড় সফর।
