রাউজান জুমার নামাজের দিন। রাউজানের ডাবুয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বায়তুল আমান জামে মসজিদের প্রাঙ্গণে মানুষের ঢল। তবে এটি কোনো ধর্মীয় উৎসব কিংবা সামাজিক আয়োজনের জন্য নয়। মসজিদের সামনে এসে থামে দুটি অ্যাম্বুলেন্স। ভেতরে শুয়ে আছেন সেই মানুষটি, যিনি প্রতি জুমায় এই মসজিদে এসে মুসল্লিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতেন, এলাকার শিক্ষা বিস্তার, সমাজ উন্নয়ন ও মানবকল্যাণের নানা পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতেন। আজ তিনি নিজেই ফিরেছেন নিঃশব্দ, নিথর। তার পাশেই চিরনিদ্রার সঙ্গী হয়েছেন জীবনসঙ্গিনী। চট্টগ্রাম নগরীর শুলকবহর এলাকায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষক নাজিম উদ্দিন (৪৮) ও তাঁর স্ত্রী তাসলিমা আক্তার (৪০)-এর মরদেহ শুক্রবার সকালে গ্রামের বাড়ি রাউজানের খোশাল তালুকদার বাড়িতে পৌঁছালে পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। মসজিদের দক্ষিণ পাশের কবরস্থানে পাশাপাশি খনন করা হয় দুটি কবর। সেখানে শেষ আশ্রয় নেন জীবনের প্রতিটি পথ একসঙ্গে পাড়ি দেওয়া এই শিক্ষক দম্পতি। আর সেই জোড়া কবর থেকে মাত্র চারশ মিটার দূরেই দাঁড়িয়ে আছে তাদের স্বপ্নের নতুন বসতভিটা। ২২ গণ্ডা জমির ওপর গড়ে উঠছিল বহু দিনের স্বপ্নের ঠিকানা। শানদারঘাটের আদলে খনন করা হয়েছিল একটি পুকুর। নিজেদের হাতে লাগানো নানা ফলজ ও বনজ গাছ ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল। তিন সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যতের সুন্দর সংসারের স্বপ্নে নির্মাণাধীন ছিল নতুন বাড়ি। স্বজনরা জানান, বিগত ৬মাস ধরে নতুন ভিটায় বাড়ির কাজ শুরু করেছেন। সেখানে আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে মিলাদ, ফাতেহা ও মেজবানের আয়োজন করার কথাও ছিল। সেই আনন্দঘন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিল নীরবে। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে সব পরিকল্পনা মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। যে উঠানে আত্মীয়-স্বজনদের হাসিমুখে স্বাগত জানানোর কথা ছিল, সেখানে শুক্রবার জড়ো হন শোকাহত মানুষ। নতুন ভিটার সামনে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে দুটি অ্যাম্বুলেন্স। স্বপ্নের উঠানেই নিথর হয়ে শুয়ে থাকেন শিক্ষক দম্পতি। আনন্দের অপেক্ষায় থাকা বাড়িটি যেন মুহূর্তেই পরিণত হয় এক নীরব শোকস্তব্ধ প্রাঙ্গণে। গত বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নগরীর মুরাদপুর কনভেনশন সেন্টারের সামনে একটি কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় প্রাণ হারান নাজিম উদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী তাসলিমা আক্তার। তারা চকবাজার ডিসি রোডের বাসা থেকে স্কুটিতে করে শাশুড়ির বাসায় যাচ্ছিলেন। পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনার পর গুরুতর আহত অবস্থায় পথচারীরা তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন। নাজিম উদ্দিন ছিলেন উইলস স্টার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ এবং তাঁর স্ত্রী তাসলিমা আক্তার একই প্রতিষ্ঠানের উপাধ্যক্ষ। দীর্ঘদিন ধরে তারা শিক্ষার আলো ছড়িয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন গঠনে নিরলসভাবে কাজ করে আসছিলেন। তাদের তিন ছেলে -হেলাল মাহমুদ, সাইফ মাহমুদ ও সিয়াম মাহমুদ একসঙ্গে হারালেন বাবা-মাকে। মুহূর্তেই অনাথ হয়ে পড়ল একটি পরিবার। কর্মসূত্রে নগরীতে বসবাস করলেও গ্রামের প্রতি ছিল তাদের গভীর টান। প্রায়ই গ্রামে আসতেন। সামাজিক, শিক্ষামূলক ও ধর্মীয় নানা কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন। গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়াতেন সবসময়। শুক্রবার সকালে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর শেষবারের মতো তাদের দেখতে ভিড় করেন আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেকেই অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, শুধু দুটি প্রাণ নয়, সমাজ হারিয়েছে শিক্ষার দুটি আলোকবর্তিকা। গ্রামবাসীর ভাষ্য, বেপরোয়া যানবাহন চলাচল ও সড়কে শৃঙ্খলার অভাবের কারণে প্রতিনিয়ত এ ধরনের মূল্যবান প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। তারা সড়কে লাইসেন্সবিহীন ও বেপরোয়া যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর আইন প্রয়োগ এবং কার্যকর নজরদারির দাবি জানান। একটি দুর্ঘটনা শুধু দুটি জীবনই কেড়ে নেয়নি; ভেঙে দিয়েছে একটি পরিবারের অসংখ্য স্বপ্ন, নিভিয়ে দিয়েছে তিন সন্তানের আশ্রয়ের প্রদীপ, আর আনন্দের অপেক্ষায় থাকা একটি নতুন বাড়িকে পরিণত করেছে আজীবনের বেদনার স্মারকে।
