back to top
Wednesday, July 22, 2026

বাঁশখালীর ভয়াবহ বন্যায় তিন খাতে ক্ষতি ১১৬ কোটি টাকারও বেশি

তৌহিদ-উল বারী,কন্ট্রিবিউটর | ১৯ জুলাই, ২০২৬ ১০:২৭

টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা আঘাত হেনেছে। বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উপজেলা প্রশাসনের প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, শুধু কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেই প্রায় ১১৬ কোটি ১৩ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এর বাইরে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্রিজ-কালভার্ট ও হাজারো বসতঘরও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষি ও মৎস্য খাতে। হাজার হাজার কৃষক ও মাছচাষি তাদের বছরের প্রধান আয়ের উৎস হারিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংখ্য খামার, ফলে জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বহু পরিবার।

প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে আসা সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ক্ষয়ক্ষতির সার্বিক প্রতিবেদন তুলে দেওয়া হয়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, বন্যায় ২৬ হাজার ৮০০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। প্রায় ৩ হাজার ৪৪৬ দশমিক ৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন সবজি, আমনের বীজতলা, পেঁপে, পান, আদা ও হলুদের আবাদ। এসব ফসলের ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্য প্রায় ৫৫ কোটি টাকা বলে প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। দ্রুত বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা গেলে তারা আবার চাষাবাদে ফিরতে পারবেন।

অন্যদিকে, মৎস্য বিভাগের হিসাবে বন্যায় ৪ হাজার ২০০টি পুকুর ও দিঘি এবং ৩১০টি চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৯৮৩ দশমিক ৩৩ মেট্রিক টন মাছ, ১ হাজার ২৮৫ দশমিক ৭০ লাখ মাছের পোনা এবং ২০০ লাখ চিংড়ির পিএল পানির স্রোতে নষ্ট বা ভেসে গেছে। পাশাপাশি ১০ জন জেলে, ১৫০টি নৌকা-ট্রলার এবং ২ হাজার ৫০টি মাছ ধরার জালও ক্ষতির শিকার হয়েছে। এ খাতে মোট ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৫১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. তৌসিব উদ্দিন বলেন, বন্যায় মাছচাষিরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। সরকারি সহায়তা ছাড়া অনেকের পক্ষে পুনরায় উৎপাদনে ফেরা কঠিন হবে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, বন্যায় ১ হাজার ২৭০টি গবাদিপশুর খামার ও ৭৪০টি পোল্ট্রি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। অনেক খামারে পশুখাদ্যের সংকট তৈরি হয়েছে এবং রোগব্যাধির আশঙ্কাও বেড়েছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জুয়েল মজুমদার বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের সহায়তা এবং প্রাণিসম্পদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

অবকাঠামো খাতেও ক্ষতির পরিমাণ কম নয়। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ৫৮টি সড়কের প্রায় ৩৮ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৬০টি ব্রিজ ও কালভার্ট এবং মোট ১০৯ কিলোমিটার সড়ক বিভিন্নভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছে। বন্যায় ৫ হাজার ১১০টি ঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং ৬ হাজারটি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে খানখানাবাদ ও কাথরিয়া ইউনিয়নে।

প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুর্গত মানুষের জন্য সরকারিভাবে ১৭৫ মেট্রিক টন চাল, ১০ হাজার ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৭ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার, ১ লাখ ৩০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ১০০টি হাইজিন বক্স, ১৫৬টি জেরিকেন এবং প্রয়োজনীয় ওআরএস বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগ ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে প্রায় ৮০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ৩৫ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, জরুরি খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গৃহ পুনর্নির্মাণ, কৃষকদের জন্য বীজ ও সার, মাছচাষিদের জন্য পোনা এবং খামারিদের জন্য পশুখাদ্য ও পুনর্বাসন সহায়তা।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ইতোমধ্যে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং সরকারিভাবে পাওয়া টিনসহ অন্যান্য সহায়তা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ