back to top
Saturday, September 5, 2026

চট্টগ্রাম নগর পানি সেবায় ম্যাক্স ফাউন্ডেশন ও ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে চুক্তি করল চট্টগ্রাম ওয়াসা

বশির আল মামুন, চট্টগ্রাম: | ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪:৫১

সুবিধাবঞ্চিত নগরবাসীর কাছে পানি সেবা আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে নতুন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা (সিডব্লিউএএসএ)। এ লক্ষ্যে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) প্রতিষ্ঠান তিনটি তিন বছরের একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে। চট্টগ্রামের র‍্যাডিসন ব্লু হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন ও ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রধান মহামান্য জন্না ভ্যান ডার লিন্ডেনের উপস্থিতিতে এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়।
নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এমওইউতে স্বাক্ষর করেন চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. এটিএম তারিকুল ইসলাম এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ামিন ফারুক। বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের পানি ও জলবায়ুবিষয়ক ফার্স্ট সেক্রেটারি ইঙ্গে ক্লাসেন এমওইউ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
এর আওতায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় উদ্ভাবনী সরকারি-বেসরকারি পানি সেবা মডেল নিয়ে যৌথভাবে কাজ করা হবে। কার্যক্রমের শুরুতে দুটি ওয়ার্ডে প্রয়োজন নিরূপণ ও একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
এই সহযোগিতাকে বাংলাদেশের পানি খাতে একটি নতুন দিকের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নগর পানি সেবায় পিপিপি মডেল যৌথভাবে পরীক্ষার জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসার সঙ্গে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন ও ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা।
গত মে মাসে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের (ম্যাক্স ট্যাপ ওয়াটার) পরিচালিত একটি দ্রুত মূল্যায়নের পর এই এমওইউ স্বাক্ষর করা হলো। ওই মূল্যায়নে দেখা গেছে, ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের মোট ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৯ জন বাসিন্দার নিরাপদ পানীয় জলের পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকার নেই। এসব এলাকায় চট্টগ্রাম ওয়াসার পাইপলাইন নেটওয়ার্ক মাত্র ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পরিবারের কাছে পৌঁছেছে।
দ্রুত মূল্যায়নে আরও দেখা যায়, অধিকাংশ বাসিন্দা বর্তমানে বেসরকারি বিক্রেতাদের কাছ থেকে পানি কিনে ব্যবহার করছেন। দুই ওয়ার্ডে এ ধরনের ৮৫ থেকে ১১৫ জন পানি বিক্রেতা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তারা প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ লিটার পানির জন্য নগদ ২৫ থেকে ৫০ টাকা নিচ্ছেন।
এ ছাড়া ওই এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা অত্যন্ত বেশি। পরীক্ষায় লবণাক্ততার মাত্রা সর্বোচ্চ ৬ হাজার পিপিএম পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যেখানে জাতীয়ভাবে নিরাপদ সীমা ১ হাজার পিপিএম।
বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের পানি ও জলবায়ুবিষয়ক ফার্স্ট সেক্রেটারি ইঙ্গে ক্লাসেন এমওইউ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রামের জনগণের কাছে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম ওয়াসা, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন ও ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, “এটি আমাদের বৃহত্তর অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ—একটি সৃজনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং শেষ মাইল পর্যন্ত সংযোগ নিশ্চিত করা। সরকার একা সবসময় শেষ প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না। এনজিওগুলোর রয়েছে মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোর সক্ষমতা, বেসরকারি খাত নিয়ে আসে অভিজ্ঞতা, অর্থায়ন ও বিনিয়োগ, আর সরকার দেয় প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সমন্বয়। এই তিন শক্তিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং আমি আনন্দিত যে এই প্রকল্পটি সেই নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন ও ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রধান জন্না ভ্যান ডার লিন্ডেন বলেন, বিশেষ করে পানি খাতে বাংলাদেশের প্রতি নেদারল্যান্ডসের দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম বলেন, তিন প্রতিষ্ঠানের এই অংশীদারত্ব নগর পানি ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি করছে। ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. এটিএম তারিকুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ—সরকার, বেসরকারি খাত এবং উন্নয়ন সহযোগীদের—সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মানুষের ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দিয়ে একটি কার্যকর পরিবর্তন আনতে সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ামিন ফারুক বলেন, বরিশাল ও খুলনায় বাস্তবায়িত তাদের পানি সরবরাহের কিছু মডেল বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও প্রয়োগ করার লক্ষ্যে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন ও ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ কাজ করছে। এর মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের পানি সরবরাহ পরিস্থিতির বর্তমান চিত্র তুলে ধরেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বাসিন্দাদের পক্ষে ইসরাফিল খসরু।
এই অংশীদারত্বের ভিত্তি তৈরি হয়েছে ‘বিল্ডিং ওয়াটার বিজনেস (বিডব্লিউবি)’ কর্মসূচির অভিজ্ঞতার ওপর। নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহায়তায় ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত এই কর্মসূচির আওতায় পটুয়াখালী, বরিশাল ও খুলনায় ১০৫টির বেশি বিকেন্দ্রীভূত পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে পেশাদারভাবে পরিচালিত এবং অর্থের বিনিময়ে পানি সরবরাহ সেবা সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব—এমন একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি হয়েছে।
নতুন এই সহযোগিতার মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতাকে ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করা হবে। শুধু কমিউনিটিভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার পরিবর্তে, সরকারি তদারকির অধীনে চট্টগ্রাম ওয়াসার বিদ্যমান অবকাঠামো ও বৃহৎ পরিসরে পানি সরবরাহের সক্ষমতার সঙ্গে বেসরকারি খাতের পরিচালনাগত ও বাণিজ্যিক দক্ষতাকে কীভাবে সমন্বিত করা যায়, তা অনুসন্ধান করা হবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ