প্রস্তাবিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার সদর দপ্তর যুক্তিযুক্ত স্থানে স্থাপনের দাবিতে সড়ক অবরোধ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয়রা। তিন ঘণ্টা পর ফেনী-খাগড়াছড়ি মহসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ‘উত্তর ফটিকছড়ির সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে উপজেলার হেয়াকো, নারায়ণহাট ও দাঁতমারা এলাকায় এসব কর্মসূচি পালন করা হয়।
বিক্ষোভকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে চট্টগ্রামের বারৈয়াহাট-খাগড়াছড়ি ও কাজীরহাট-হেয়াকো সড়ক অবরোধ করেন। এতে প্রায় তিন ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে উপজেলা প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি, সর্বশেষ গণশুনানির প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন উপজেলার সদর দপ্তর নারায়ণহাট ও দাঁতমারার মধ্যবর্তী স্থানে বা সবার জন্য সুবিধাজনক কোনো জায়গায় করতে হবে। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ফটিকছড়িকে বিভক্ত করে নতুন উপজেলা গঠনের সরকারি উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে একটি মহল সদর দপ্তর ভুজপুর থানার কাছাকাছি নেওয়ার চেষ্টা করছে। এমনটি হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির সঠিক প্রতিফলন ঘটবে না। এ সময় বক্তব্য দেন বাগান বাজার ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান একরামুল হক বাবুল, ভুজপুর থানা যুবদলের সাবেক আহবায়ক নুরুল আমিন আজাদ, ভুজপুর থানা যুবদলের সভাপতি একরামুল হক একরাম, ব্যাংকার হাসান শামসুদ্দিন, ইদ্রিস মিয়া ইলিয়াস, সাংবাদিক কামাল উদ্দিন প্রমুখ। সমাবেশে নুরুল আমিন আজাদ অভিযোগ করেন, ফটিকছড়ির উত্তরাঞ্চল যুগ যুগ ধরে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগ অবকাঠামোগত দিক থেকে অবহেলিত। অথচ উত্তরাঞ্চলের চারটি ইউনিয়ন থেকে সরকার সর্বোচ্চ রাজস্ব পায় এবং এখানে প্রায় এবং এখানে ধাম দুই লাখ মানুষের বসবাস। তাই দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটাতে দাঁতমারা বা নারায়ণহাট এলাকায় সদর দপ্তর স্থাপন করা যৌক্তিক বলে তিনি মন্তব্য এদিকে প্রস্তাবিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার সীমানা নিয়েও স্থানীয়দের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বৃহত্তর সুয়াবিল ইউনিয়ন এবং নাজিরহাট পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডকে নতুন উপজেলার অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করে আসছে ‘বৃহত্তর সুয়াবিল অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’। আইনি জটিলতা এড়াতে এসব এলাকা বাদ দেওয়ার দাবিতে তাদের একটি মামলাও আদালতে চলমান রয়েছে। প্রস্তাবিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলায় সুয়াবিল ইউনিয়ন এবং নাজিরহাট পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডকে অন্তর্ভুক্ত না করার দাবীতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করে। দাবী মানা না হলে কঠোর কর্মসূচীর হুশিয়ারি দেন বক্তারা।
সার্বিক বিষয়ে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, “স্থানীয়রা সদর দপ্তর স্থাপনের দাবি নিয়ে মানববন্ধন ও আন্দোলন করেছিলেন। তাদের বুঝিয়ে বলা হয়েছে যে, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি সরকার বিষয়টি বিবেচনা করবে।”
বুধবার নিকারের সভায় নতুন এই উপজেলার প্রস্তাবটি উত্থাপনের কথা রয়েছে বলেও জানান ইউএনও। উল্লেখ্য,দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী প্রশাসনিক সুবিধা, উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণ ও জনসেবার মানোন্নয়নের স্বার্থে বৃহত্তর ফটিকছড়ি উপজেলাকে ভাগ করে নতুন উপজেলা সৃষ্টির দাবি জানিয়ে আসছে। তারই প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের বৃহত্তম উপজেলা ফটিকছড়িকে ভাগ করে দুটি আলাদা উপজেলা করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে মন্ত্রি পরিষদ বিভাগ। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ফটিকছড়ি উপজেলার পাশাপাশি আরেকটি হচ্ছে ‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা’। ১ জুলাই প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় এ প্রস্তাব পাস হবে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এরআগে, গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ সচিব আব্দুর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রি-নিকার সভায় নতুন এই উপজেলা গঠনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর গেজেট ও প্রশাসনিক কাঠামো গঠন প্রক্রিয়া শুরু হবে। নতুন উপজেলা সৃষ্টির মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম সহজ হবে এবং সেবাপ্রাপ্তি আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে। প্রস্তাবিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা ঘোষণার পরপরই যথাযথ স্থানে সদর দপ্তর স্থাপনের দাবীতে আন্দোলন করে আসছে উত্তর ফটিকছড়িবাসী।
এদিকে ভুজপর থানা ভুজপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। এদিকে ভুজপুরবাসীর দাবী থানার পাশেই উপজেলা সদর দপ্তর হোক। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বৃহৎ এই উপজেলাকে ভাগ করে নতুন আরেকটি উপজেলা গঠনের প্রক্রিয়াটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কারণ, সরকারের যেসব উন্নয়নমূলক বরাদ্দ বরাবরই আসে, বিভক্ত হলে তা দ্বিগুণ হবে। তবে এই বিভাজন কোনো ঐতিহাসিক বিচ্ছিন্নতার কারণে নয়, বরং উন্নয়ন ও জনসেবার সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়িয়ে দিতে। নতুন উপজেলা গঠনের পর অবকাঠামোগত কার্যক্রম শতভাগ কার্যকর হতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে জনসেবাপ্রাপ্তি অনুমোদনের পরই শুরু হবে। সরকারের সিদ্ধান্তের সাথে সাথে নতুন উপজেলা কার্যকর হবে। শুরুতে নতুন একজন উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা যোগ দেবেন। পরে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের পদায়ন হবে বলে জানা যায়।
