চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এসএস পাওয়ার-১ বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা আমদানিতে অর্থসংকট দেখা দিয়েছে। বিপিডিবির কাছে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় নতুন করে কয়লা আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে পারছে না কেন্দ্র পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেড।
কেন্দ্রটিতে বর্তমানে যে পরিমাণ কয়লা রয়েছে, তা দিয়ে আগামী ৫ আগস্ট পর্যন্ত উৎপাদন চালানো সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে নতুন কয়লার ব্যবস্থা করা না গেলে কেন্দ্রটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে জরুরি ভিত্তিতে অন্তত ৮০০ কোটি টাকা চেয়েছে এসএস পাওয়ার-১। এ বিষয়ে বিপিডিবির চেয়ারম্যানের কাছে দুই দফায় চিঠি দিয়েছেন কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ট্যান ঝেলিং।
সর্বশেষ গত ২৭ জুলাই পাঠানো চিঠিতে কোম্পানিটি জানায়, জুন ২০২৫ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের বিপরীতে বিপিডিবির কাছে তাদের মোট পাওনা ৩ হাজার ১৬৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে অন্তত ৮০০ কোটি টাকা দ্রুত পরিশোধ করা প্রয়োজন। অন্যথায় কয়লা আমদানি ও কেন্দ্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
এক মাস আগেই এলসি খোলার প্রয়োজন
কোম্পানিটির ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশ থেকে কয়লা নিয়ে আসা মাদার ভেসেল বুকিংয়ের জন্য অন্তত এক মাস আগে এলসি খুলতে হয়। কিন্তু কয়লা আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকায় নতুন চালানের বুকিং দেওয়া যাচ্ছে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আরেকটি শর্ত। কয়লা আমদানির এলসি ইস্যুর ক্ষেত্রে ব্যাংকে শতভাগ মার্জিন জমা রাখতে হয়। অর্থসংকটের কারণে সেই অর্থও জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে বর্তমান মজুদের ওপর নির্ভর করেই উৎপাদন চালাতে হচ্ছে কেন্দ্রটিকে। কোম্পানিটির আশঙ্কা, দ্রুত অর্থ না পেলে ৫ আগস্টের পর কয়লার অভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।
শুধু কয়লা নয়, যন্ত্রাংশ নিয়েও শঙ্কা
বিপিডিবির কাছে পাঠানো চিঠিতে এসএস পাওয়ার-১ জানিয়েছে, কেন্দ্রের নিয়মিত উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কিন্তু বিদ্যমান অর্থসংকটের কারণে এসব আমদানিও ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
একই চিঠিতে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) একটি শর্তের বিষয়ও উল্লেখ করেছে কোম্পানিটি। চুক্তি অনুযায়ী, কোম্পানির পাওনা ১০ লাখ মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ অর্থের বেশি বকেয়া থাকলে বিপিডিবির বিদ্যুৎ গ্রহণের অধিকার রহিত হতে পারে। একই পরিস্থিতিতে কোম্পানিও বিদ্যুৎ সরবরাহের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ রাখে।
তবে কেন্দ্রটি উৎপাদন বন্ধ রাখলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পাওয়ার অধিকার কোম্পানিটির থাকবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগেও চিঠি, মেলেনি সমাধান
বকেয়া পরিশোধের দাবি জানিয়ে এর আগে গত ৭ জুলাই বিপিডিবিকে চিঠি দিয়েছিল এসএস পাওয়ার-১। কিন্তু ওই চিঠির পরও অর্থ পরিশোধে কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ায় ২৭ জুলাই আবারও বিপিডিবির চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় চিঠিতে দ্রুত অন্তত ৮০০ কোটি টাকা ছাড় করার অনুরোধ জানিয়ে কোম্পানিটি সতর্ক করেছে, অর্থের ব্যবস্থা না হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ধরে রাখা কঠিন হবে।
এ বিষয়ে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে বিপিডিবির কোল পাওয়ার জেনারেশন পরিদপ্তরের পরিচালক মাকসুদুর রহমান বলেন, শুধু বকেয়া বিলের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যাবে- এমনটা তারা মনে করছেন না। আর্থিক বিষয়টি বিপিডিবির ফাইন্যান্স বিভাগ ভালো বলতে পারবে বলেও জানান তিনি।
মাকসুদুর রহমান বলেন, কেন্দ্রটি যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালিয়ে যেতে পারে, সেটিই তাদের প্রত্যাশা।
তবে কোনো কারণে কেন্দ্রটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি পূরণে কী ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর দেননি।
বন্ধ হলে বাড়তে পারে উৎপাদন ব্যয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে তুলনামূলক কম ব্যয় হওয়ায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
বাঁশখালীর এসএস পাওয়ার-১ কেন্দ্রটিও বিপিডিবির ‘লিস্ট কস্ট জেনারেশন’-এর অন্যতম কেন্দ্র। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৭ টাকা। বিপরীতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হতে পারে প্রায় ১৮ থেকে ২০ টাকা।
কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। পূর্ণ সক্ষমতায় চললে মাসে প্রায় ৯৫ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারে এটি।
সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, একই পরিমাণ বিদ্যুৎ ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন করতে গেলে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
এ কারণে ৫ আগস্টের মধ্যে নতুন কয়লার ব্যবস্থা করা না গেলে বাঁশখালীর এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপরই নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক ব্যয় ও সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
