back to top
Wednesday, July 22, 2026

রাউজানের কেন্দ্রীয় জগন্নাথ দেবের রথযাত্রায় হাজারো পুণ্যার্থীর ঢল

মুষলধারে বর্ষণও থামাতে পারেনি বিশ্বাসের টান; রথের দড়িতে একসঙ্গে ভক্তি, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন

গাজী জয়নাল আবেদীন, রাউজান | ১৮ জুলাই, ২০২৬ ০৫:৫১

আকাশজুড়ে কালো মেঘ। অবিরাম বর্ষণে ভিজে একাকার জনপদ। কিন্তু প্রকৃতির সেই বাধা ছাপিয়ে রথের দড়িতে হাত রাখতেই যেন উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন হাজারো ভক্ত। বৃষ্টিধারার সঙ্গে মিশে যায় প্রার্থনার সুর, শঙ্খধ্বনি আর জয়ধ্বনি। ধর্মীয় বিশ্বাস, শতবর্ষের ঐতিহ্য এবং সম্প্রীতির অপূর্ব মিলনমেলায় বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) চট্টগ্রামের রাউজানের জলিলনগর শ্রী শ্রী জগন্নাথ সেবাশ্রমে পালিত হলো রাউজানের কেন্দ্রীয় শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা। দিনব্যাপী পূজা-অর্চনা, ভজন-সংগীত, ধর্মীয় আলোচনা এবং বর্ণাঢ্য রথ শোভাযাত্রাকে ঘিরে সেবাশ্রম প্রাঙ্গণ পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়। সকাল থেকেই উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে দলে দলে ভক্ত-অনুরাগীরা সেবাশ্রমে এসে জড়ো হন। বয়স, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভেদাভেদ ভুলে সবাই একসূত্রে গাঁথা হন ভক্তি আর উৎসবের আনন্দে।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর পুত্রবধূ ফারনাজ আলম কাদের চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শক্তি তার ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে। এই ঐতিহ্য রক্ষা করা সবার নৈতিক দায়িত্ব। সেবাশ্রম পরিচালনা পরিষদের সভাপতি দীলিপ কুমার চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে এবং প্রণব চৌধুরী মিটুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন রাউজান প্রেস ক্লাবের সভাপতি প্রদীপ শীল। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন রাউজান থানার ওসি (তদন্ত) নিজাম উদ্দিন দেওয়ান, রাউজান পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর রেজাউর রহিম আজম এবং সনাতনী সম্প্রদায় ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক লিটন মহাজন লিটু। এ সময় উপজেলা যুবদলের সভাপতি এম শাহজান সাহিল, জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক রাসেল খান, রাউজান পৌরসভা যুবদলের সভাপতি আরিফুল ইসলাম, মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক টিপু কান্তি দে, সহসভাপতি অশোক পালিত, প্রবীণ শিক্ষক রাখাল চন্দ্র দে, পরিচালনা পরিষদের সদস্য চন্দন শীল, রাউজান পৌর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সদীপ দে সজীব, ধীলন মুহুরী, দিবাকর বোস বাবু, রনজিত শীল, সমীর শীল, চন্দ্রশেখর দে, বিজন চৌধুরী, বাসু পালিত, ভানু শীল, ইমন সেন, কাঞ্চন দে, শংকর দে ও রাজিব দে-সহ সেবাশ্রম পরিচালনা কমিটির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ধর্মীয় রীতি অনুসারে শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেব, বলভদ্র ও সুভদ্রার বিগ্রহ সুসজ্জিত রথে আরোহন করানোর মধ্য দিয়ে মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বিকেল ৪টায় চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়কের জলিলনগর বাসস্টেশন এলাকা থেকে বের হয় বর্ণাঢ্য কেন্দ্রীয় রথ শোভাযাত্রা। ঠিক তখনই নামে মুষলধারে বৃষ্টি। কিন্তু সেই বৃষ্টি যেন ভক্তদের উৎসাহ আরও বাড়িয়ে দেয়। ভিজতে ভিজতেই হাজারো পুণ্যার্থী রথের দড়িতে হাত রাখেন। প্রবল বর্ষণের মধ্যে একসঙ্গে রথ টানার সেই দৃশ্য ধর্মীয় আবেগ, বিশ্বাস ও ঐক্যের এক বিরল প্রতীক হয়ে ওঠে। শোভাযাত্রাটি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বন্যাপুকুরপাড় এলাকা প্রদক্ষিণ করে পালিতপাড়া শিবমন্দিরে অবস্থিত ‘মাসির বাড়ি’তে পৌঁছায়। সেখানে হাজারো ভক্তের সম্মিলিত অংশগ্রহণে সম্পন্ন হয় রথযাত্রার অন্যতম প্রধান ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। আয়োজকদের মতে, রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি ভক্তি, ঐতিহ্য, সহমর্মিতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক। প্রতি বছরের মতো এবারও বিপুল মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই উৎসবের আবেদন অটুট রয়েছে। প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের আন্তরিক তৎপরতায় পুরো আয়োজন শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়। দিন শেষে বৃষ্টিভেজা রথ, ভক্তদের উচ্ছ্বাস আর প্রার্থনার ধ্বনি যেন আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, প্রকৃত বিশ্বাসের শক্তি কোনো প্রতিকূলতাই থামিয়ে রাখতে পারে না।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ