back to top
Saturday, September 5, 2026

চুয়েটের অভিশপ্ত পুকুর; পানিতে ডুবে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু

১৫ দিনের ব্যবধানে একই পুকুরে ডুবে তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু

গাজী জয়নাল আবেদীন, রাউজান | ১২ আগস্ট, ২০২৬ ১৩:৩৭

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) একটি পুকুর যেন পরিণত হয়েছে মৃত্যুর মর্মান্তিক ফাঁদে। মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে একই পুকুরে ডুবে প্রাণ গেল তিন শিক্ষার্থীর। সর্বশেষ বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে পুকুরের পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর। পাশাপাশি একই ঘটনায় দুই তরুণ প্রাণের নিভে যাওয়া শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো ক্যাম্পাসে।
নিহতরা হলেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের ২০২৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও আবু সাঈদ হলের আবাসিক ছাত্র অর্ণব চন্দ (২২) এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের একই ব্যাচের শিক্ষার্থী ও শহীদ শাহ মোহাম্মদ হলের আবাসিক ছাত্র শান্ত দেব (২২)। তাঁদের দুজনের বাড়িই সিলেট জেলায়। তাঁরা একই গ্রামের বাসিন্দা বলেও জানা গেছে।


প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, বুধবার বেলা দেড়টার দিকে সহপাঠীদের সঙ্গে ফুটবল খেলে ক্লান্ত হয়ে অর্ণব ও শান্ত গোসল করতে নামেন কাজী নজরুল ইসলাম হল ও শহীদ শাহ মোহাম্মদ হলের মধ্যবর্তী পুকুরে। তাঁরা শাহ মোহাম্মদ হলের পাশ থেকে পুকুরটি আড়াআড়িভাবে সাঁতরে কাজী নজরুল ইসলাম হলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
পুকুরের মাঝামাঝি যাওয়ার পর একজন হঠাৎ ক্লান্ত হয়ে পানিতে তলিয়ে যেতে থাকেন। তাঁকে উদ্ধারে এগিয়ে যান অপরজন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুজনই পানির গভীরে তলিয়ে যান। সহপাঠীরা তাৎক্ষণিকভাবে পানিতে নেমে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে অর্ণবকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও শান্তকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
খবর পেয়ে রাঙ্গুনিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাত সদস্যের একটি ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। প্রায় আধা ঘণ্টা পর পুকুরের গভীর থেকে শান্তকে নিথর অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক অ্যাম্বুল্যান্সে দুজনকে নগরীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন। উদ্ধারের সময় অর্ণবের শ্বাসপ্রশ্বাস ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
রাঙ্গুনিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লিডার জাহেদুর রহমান বলেন, ‘দুপুর দেড়টার দিকে খবর পেয়ে আমরা ১০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করি। অল্প সময়ের মধ্যেই শান্ত নামে একজনকে উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুল্যান্সে এভারকেয়ার হাসপাতালে পাঠানো হয়। আমরা পৌঁছানোর আগেই শিক্ষার্থীরা আরেকজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছিল।
চুয়েটের এই পুকুরে এর আগেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় একই পুকুরে গোসল করতে নেমে পানির গভীরে তলিয়ে মারা যান যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী অর্ণব সাহা। তিনি ফেনী জেলার বাসিন্দা ছিলেন।
সেই মৃত্যুর মাত্র ১৫ দিনের মাথায় একই পুকুরে আবারও একসঙ্গে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হলো। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে একই জলাশয়ে তিন মেধাবী তরুণের প্রাণহানির ঘটনায় পুকুরটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক ও গভীর শোক।
একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত ক্যাম্পাসে এমন ধারাবাহিক প্রাণহানি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে পুকুরটির নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের সাঁতার কাটা কিংবা গোসলের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, ঘাটগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সতর্কতামূলক নির্দেশনা কতটা কার্যকর ছিল, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
পরপর তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর বুধবার বিকেলে পুকুরটির তিন পাশের তিনটি ঘাটে টিনের বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সরেজমিনে দেখা যায়, ঘাটগুলোতে টিন দিয়ে প্রবেশের পথ বন্ধ করা হচ্ছে। টিনের ওপর লাগানো হচ্ছে সতর্কতামূলক নোটিশ।
নোটিশে লেখা রয়েছে, ‘পুকুরের পানিতে নামা সম্পূর্ণরূপে নিষেধ। আদেশক্রমে কর্তৃপক্ষ।’
চুয়েট ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাসুম রানা প্রামাণিক বলেন, পরপর এমন ঘটনা খুবই দুঃখজনক। দুই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে আমাদের নিজস্ব অ্যাম্বুল্যান্সে করে নগরীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শোকাহত।
পুকুরের ঘাটে বেড়া দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের পুকুরে নামার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা ছিল। তারপরও তাঁরা পুকুরে নামেন। এবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশক্রমে ঘাটগুলোতে বেড়া দেওয়া হচ্ছে।
দুই তরুণের আকস্মিক মৃত্যুতে চুয়েটের প্রাণচঞ্চল ক্যাম্পাস যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। যে পুকুরের পানিতে সহপাঠীদের সঙ্গে কিছুটা স্বস্তি খুঁজতে নেমেছিলেন অর্ণব ও শান্ত, সেই পানিই কেড়ে নিল তাঁদের জীবন। আর মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে একই পুকুরে তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু এখন নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নয়, বরং তাৎক্ষণিক ও কঠোর পদক্ষেপের তাগিদ হয়ে সামনে এসেছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ